Close Menu
জনমত
    Facebook X (Twitter) Instagram
    Home»অপরাধ»গোলাম রব্বানী টুপুলের ছোটগল্প- অগ্নি
    অপরাধ

    গোলাম রব্বানী টুপুলের ছোটগল্প- অগ্নি

    অনলাইন ডেস্কBy অনলাইন ডেস্কFebruary 21, 2026No Comments5 Mins Read
    Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email

    বনের নাম ছিল অরুণাবন। সেখানে বহু বছর ধরে ন্যায় আর সাহসের প্রতীক হয়ে রাজত্ব করতেন সিংহ African Lion। তার গর্জন শুধু শক্তির নয়, ছিল শৃঙ্খলা ও আশ্রয়েরও প্রতীক। হরিণ, মহিষ, খরগোশ, এমনকি চঞ্চল বানররাও জানত— বনের আইন সবার জন্য সমান। কিন্তু এক বর্ষার রাতে সবকিছু বদলে গেল।

    সেই রাতে চতুর এক হায়না, নাম তার কুটিল, মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে দিল— সিংহ নাকি অসুস্থ, দুর্বল, আর শিগগিরই বন ছেড়ে পালাবে। হায়নার দল চারদিকে ফিসফাস করতে লাগল। ‘রাজা দুর্বল হলে বনও দুর্বল হয়,’ তারা বলল। ভয় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল।

    কুটিল সুযোগ বুঝে সিংহের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে প্রলোভন দিল। কেউ পেল মাংসের ভাগ বেশি, কেউ পেল নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। ভোরের আগে সিংহকে আক্রমণ করা হলো। আহত সিংহ প্রাণে বাঁচলেও বন ছেড়ে দূরে পাহাড়ের দিকে চলে যেতে বাধ্য হলেন। কুটিল হায়না নিজেকে ঘোষণা করল বনের নতুন শাসক। তারপর শুরু হলো অন্ধকার অধ্যায়। হায়নার রাজত্বে আইন ছিল না, ছিল কেবল ভয়। হরিণদের প্রতিদিন দ্বিগুণ কর দিতে হতো। খরগোশদের বিল দখল করে নিত হায়নার দল। বানরদের ফলের বাগান থেকে জোর করে সংগ্রহ করা হতো। কেউ প্রতিবাদ করলে রাতের অন্ধকারে সে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যেত। বনের তরুণরা সব দেখছিল।

    এক যুবক মহিষ, নাম তার অগ্নি, দাঁতে দাঁত চেপে বলত, ‘এভাবে আর কত?’ তার বন্ধু ছিল তরুণ হরিণ, চঞ্চল বানর, আর সাহসী চিতা। তারা একে একে অন্য যুবকদের ডেকে গোপনে বৈঠক করল শুকনো বটগাছের তলায়। অগ্নি বলল, ‘আমরা ভয় পেলে চলবে না। বন আমাদের। রাজা হয়তো দুর্বল হয়েছেন, কিন্তু বন তো দুর্বল হয়নি। এক চিতা প্রশ্ন করল, ‘যদি আমরা হেরে যাই?’ অগ্নি শান্ত গলায় বলল, ‘তাহলে অন্তত আমরা মাথা উঁচু করে মরব।’ সিদ্ধান্ত হলো—পূর্ণিমার রাতে বিদ্রোহ। সেই রাতে চাঁদের আলোয় বন যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে ছিল। হায়নারা ভোজে মত্ত। হঠাৎ চারদিক থেকে গর্জন, ধাক্কা, আর দৌড়ের শব্দ উঠল। মহিষরা শিং উঁচু করে আক্রমণ করল। বানররা গাছের ডাল ভেঙে ছুড়ল। হরিণরা গতির ঝড়ে বিভ্রান্ত করল শত্রুকে। যুদ্ধ সহজ ছিল না। অগ্নির পাশে দাঁড়ানো তরুণ হরিণটি পড়ে গেল প্রথমেই। এক চিতা শেষ নিঃশ্বাসে বলল, ‘বনকে বাঁচাও…’। রক্তে ভিজে গেল শুকনো পাতা। কিন্তু যুবকদের সাহস থামল না। শেষ পর্যন্ত কুটিল হায়না বুঝল—এ বন তাকে আর মানে না। সে পালাল, তার দল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ভোর হলো। রক্তিম সূর্য উঠল। বনে নীরবতা। অনেক যুবক আর নেই। সেই সময় পাহাড়ের গুহা থেকে খবর পাঠানো হলো নির্বাসিত সিংহের কাছে। ‘রাজা, বন মুক্ত। ফিরে আসুন।’ কয়েকদিন পর তিনি ফিরলেন। বয়সে ক্লান্ত, চোখে মিশ্র অনুভূতি। বনবাসীরা তাকে ঘিরে উল্লাস করল। কেউ বলল, ‘আপনার অনুপস্থিতিতে আমরা কষ্টে ছিলাম।’ কেউ চোখের জল মুছল। যুবকদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে সিংহ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর বললেন, ‘আমি তো জানতাম, তোমরা আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।’ অগ্নি এগিয়ে এসে মাথা নত করে বলল, ‘রাজা, আমরা বনকে বাঁচাতে লড়েছি। অনেকে প্রাণ দিয়েছে।’ সিংহ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমি ফিরে এসেছি বলেই বন বেঁচেছে। আমার উপস্থিতিই ছিল আশার কারণ।’ বনের বাতাস যেন থমকে গেল। অগ্নি বিস্ময়ে তাকাল। ‘রাজা, যদি আমরা না লড়তাম?’ সিংহ চোখ ফিরিয়ে নিলেন। ‘তোমরা তো আমার প্রজা। প্রজার কর্তব্য রাজাকে রক্ষা করা।’ যুবকদের মুখে ছায়া নেমে এলো। কিছুদিনের মধ্যেই রাজসভায় নতুন নিয়ম জারি হলো। ‘বিদ্রোহ’ শব্দটি নিষিদ্ধ। যারা লড়াইয়ের কথা তুলত, তাদের বলা হতো— ‘রাজাকে ছোট কোরো না।’ নিহত যুবকদের স্মৃতিফলক বসানোর প্রস্তাব বাতিল হলো। বলা হলো, ‘বনে বিভাজন সৃষ্টি হবে।’ অগ্নি প্রতিরাতে মৃত বন্ধুদের কথা ভাবত। সেই চিতার শেষ কথা, সেই হরিণের রক্তাক্ত দৃষ্টি—সব যেন বুকের ভেতর আগুন জ্বালাত। একদিন সে সাহস করে সিংহের সামনে দাঁড়াল। ‘রাজা, আমরা কি তাদের স্মরণ করতে পারি না? অন্তত একদিন?’ সিংহ কঠোর স্বরে বললেন, ‘রাজত্ব আবেগ দিয়ে চলে না। ইতিহাস আমিই লিখব।’ অগ্নি বুঝল— হায়না গেছে, কিন্তু অন্য এক ছায়া নেমে এসেছে। বনের প্রবীণ পেঁচা এক রাতে অগ্নিকে বলল, ‘শোনো, ক্ষমতা নদীর মতো। যদি বাঁধ না দাও, সে নিজের দিকেই বয়ে যায়। সিংহ ভুলতে চাইছে, কারণ স্মৃতি তাকে দায়ী করে। অগ্নি আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদ যেন সেদিনও রক্তিম ছিল। কয়েক মাস পর, বনে আবার অস্থিরতা বাড়ল। সিংহ ধীরে ধীরে কঠোর হলেন। যে প্রশ্ন করত, তাকে সন্দেহ করা হতো। হায়নার মতো নয়, কিন্তু এক অদৃশ্য ভয় ছড়িয়ে পড়ল। তবু যুবকদের কবরের পাশে প্রতিরাতে একটি করে ফুল রেখে আসত কেউ না কেউ। কোনো নাম লেখা নেই, কোনো ফলক নেই—তবু স্মৃতি আছে। একদিন ছোট্ট এক খরগোশ অগ্নিকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওরা কি সত্যি বিদ্রোহী ছিল?’ অগ্নি হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘না, তারা ছিল বনরক্ষক।’ ‘তাহলে রাজা কেন বলে না?’ অগ্নি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘কখনো কখনো রাজা নিজের ছায়াকে ভয় পায়।’ বছর ঘুরল। নতুন প্রজন্ম বড় হতে লাগল। তারা গল্প শুনল—হায়নার অত্যাচার, যুবকদের রক্ত, আর সিংহের প্রত্যাবর্তন। কিন্তু প্রতিটি গল্পে একটা ফাঁক রয়ে গেল—স্বীকৃতির ফাঁক। শেষ বয়সে সিংহ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি অগ্নিকে ডেকে বললেন, ‘তোমরা সাহসী ছিলে, আমি জানতাম। কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম—যদি সবাই বুঝে যায়, রাজাকে ছাড়াও বন টিকে থাকতে পারে।’ অগ্নির চোখ ভিজে উঠল। ‘সত্য লুকালে সে আরও বড় হয়ে ফিরে আসে, রাজা।’ সিংহের চোখ বুজে এলো। তার মৃত্যুর পর প্রথম যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা ছিল—যুবকদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ। বটগাছের তলায় পাথরে খোদাই করা হলো- ‘যারা নিজের জন্য নয়, বনের জন্য লড়েছিল।’ উদ্বোধনের দিন অগ্নি বলল, ‘রাজা ভুল করেছিলেন, কিন্তু বন ভুলবে না।’ বনের বাতাসে সেদিন আর ভয় ছিল না। ছিল বেদনা, ছিল গর্ব, আর ছিল শিক্ষা— ক্ষমতা নয়, ত্যাগই ইতিহাসের আসল ভিত্তি। আর অরুণাবন শিখল, কোনো হায়না বা সিংহ নয়— বন বেঁচে থাকে তাদের হৃদয়ে, যারা সত্যের জন্য।

    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email
    অনলাইন ডেস্ক
    • Website

    Related Posts

    অচিরেই শুটিংয়ে ফিরছেন না তানিয়া

    February 22, 2026

    রাতের আঁধারে মাটি উত্তোলন, অতঃপর…

    February 22, 2026

    প্যারিসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত

    February 22, 2026
    Leave A Reply Cancel Reply

    রেডিও বার্তা

    প্রধান সম্পাদক : মোঃ ইসমাইল হোসেন

    রেডিও বার্তা মিডিয়া লিমিটেড

    ধানমন্ডি, ঢাকা ১২০৯, বাংলাদেশ

    ইমেইল : radiobartaonline@gmail.com

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

    GET IT ON Google Play
    Download on the App Store

    অনুসরণ করুন

    আমাদের সম্পর্কে আমাদের স্টাফ গোপনীয়তার নীতি শর্তাবলি যোগাযোগ

    © ২০২৬ রেডিও বার্তা | সকল কারিগরি সহযোগিতায় রেডিও বার্তা টিম

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.